1. [email protected] : amicritas :
  2. [email protected] : newsdhaka :
বুধবার, ১২ মে ২০২১, ০৮:৩৪ পূর্বাহ্ন

বাবুই পাখি কি সত্যিই ফসলের ক্ষতি করে?

অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার
  • শেষ আপডেট: শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২১

২০২১ সালের ৯ এবং ১০ এপ্রিল ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে বাসা ভেঙ্গে ও পুড়িয়ে প্রায় ১৮৩টি বাবুই পাখি হত্যা করা হয়। যা আমাকে মর্মাহত করেছে। প্রাণিবিদ্যার ছাত্র এবং শিক্ষক হিসেবে নয় একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেও এইভাবে বাবুই পাখি হত্যা কোনোভাবেই সমর্থন করি না।

চমৎকার বুনোটের ঝুড়ির মতো নান্দনিক বাসা তৈরির সুনিপুণ কারিগর বাবুই পাখি। নান্দনিক শৈল্পিক বাসা তৈরির জন্য বাবুই পাখির বাসা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে এবং বিজ্ঞানীরা এ বাসা তৈরি করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হননি। অনেকে বাবুই পাখিকে তার অসাধারণ বুনন শৈলীর জন্য তাঁতি বলে থাকেন। তাদের ঝুলন্ত বাসায় প্রবেশের সুড়ঙ্গপথ আঁকা-বাঁকা।

পৃথিবীতে ১১৭ প্রজাতির বাবুই পাখি রয়েছে যার ৩ প্রজাতি বাংলাদেশে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের বাবুই পাখিগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়। তাল, নারিকেল, খেজুর ও রেইনট্রি গাছে এরা দলবেঁধে বাসা তৈরি করে। তবে বর্তমান সময়ে বাবুই পাখির বাসা আমরা খুব কম দেখতে পাই।

বাবুই পাখিকে শিল্পী বলা হয়ে থাকে তাদের সুনিপুণ বাসা বানানোর জন্য। বাবুই পাখির বাসা বানানোর কৌশল, দক্ষতা এবং শৈলী যেকোনো স্থপতির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বাসা বানানোতে তাদের পরিশ্রম, কৌশল বা বুদ্ধি যেকোনো মানুষ বা কারিগরকে সহজেই হার মানায়। বাসা বানানোর দক্ষতা বা শৈলীর জন্য বাবুই পাখিকে কেউ কেউ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কারিগর বলে থাকেন। বাবুই পাখি বাসা তৈরিতে তাল, নারিকেলের পাতা, নল-খাগড়া, কাশ বা হোগলা ব্যবহার করে থাকে।

বাবুই পাখির বাসা উল্টানো কলসির মতো। ঠোঁট দিয়ে ঘাসের শৈল্পিক বুনন এবং যত্ন করে পেট দিয়ে ঘষে ঘষে গোলাকৃতি করা এবং মসৃণ করার দৃশ্য কতটা নান্দনিক তা স্বচক্ষে না দেখলে কল্পনা করা যায় না। শুরুতে দুটি নিম্নমুখী গর্ত বা দরজা এবং তারপরে একদিক বন্ধ করে ডিম এবং বাচ্চা রাখার প্রকোষ্ঠ তৈরি করে। অন্যদিকে লম্বা করে প্রবেশ ও প্রস্থানের রাস্তা তৈরি করে বাবুই পাখি।

একটি মজার বিষয় হলো, শুধুমাত্র পুরুষ বাবুই বাসা তৈরি করে। পুরুষ বাসা তৈরির কাজ অর্ধেক হওয়ার পরে গান পরিবেশন করে স্ত্রী পাখিকে আমন্ত্রণ জানায় তার প্রণয় সঙ্গী হওয়ার জন্য। পুরুষ পাখির আমন্ত্রণে তার বাসা দেখতে আসে স্ত্রী বাবুই। পুরুষ পাখিটির সৌন্দর্য এবং গানের কণ্ঠের চেয়ে তার বাসা কতটা নিরাপদ সেটি স্ত্রী বাবুই-এর কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বাসাটি নিজের এবং তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ মনে হলে স্ত্রী পাখি ওই পুরুষ পাখির সাথে বসবাস শুরু করে।

স্ত্রী পাখির উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং অনুপ্রেরণায় পুরুষ পাখিটি দিনরাত পরিশ্রম করে বাসা বানানোর কাজ শেষ করে। স্ত্রী বাবুই পাখিটি ডিম দেওয়ার পর পরই পুরুষ বাবুই বাসা ছেড়ে যায় এবং নতুন বাসা তৈরির কাজ শুরু করে নতুন সঙ্গীর জন্য। এভাবে পুরুষ বাবুই এক মৌসুমে ৬ টি বাসা তৈরি করে ছয় সঙ্গীর সাথে জীবন কাটায়।

গ্রীষ্মকাল বাবুই পাখির প্রজনন মৌসুম। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে মা পাখি বাচ্চার জন্য খাবার সংগ্রহ করে। এরা সাধারণত বিভিন্ন ধরনের বীজ, ভাত, বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়, ঘাস, ফুলের মধু, রেণু ইত্যাদি খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। বাবুই পাখির খাবার এবং জীবনাচরণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকার কারণে পিরোজপুর এবং ঝালকাঠির কৃষকরা ধান খাওয়ার অপরাধে বাবুই পাখি হত্যা করেছেন। তারা জানেন না ধানের কতটা ক্ষতি বাবুই পাখি করে থাকে।
পৃথিবীতে ধানের ক্ষতিকর প্রাণী (পেস্ট) হিসেবে সবচাইতে উপরে আছে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়, ইঁদুর, ধানের রোগ, শামুক, কৃমি এবং কিছু পাখি।

পাখিদের অবস্থান প্রায় শেষের দিকে। বাবুই পাখি ধানের কতটা ক্ষতি করে সেটার গবেষণালব্ধ কোনো পরিসংখ্যান নেই তবে এর ক্ষতির পরিমাণ খুবই নগণ্য। বাবুই পাখি ধানের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ধানের উৎপাদনে সহায়তা করে। খাদ্য শৃঙ্খলে (ফুড চেইন) বাবুই পাখির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির প্রতিটি জীব পৃথিবীতে কোনো না কোনো কল্যাণের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। অজ্ঞতাবশত পাখি নিধন নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং ঘৃণ্য কাজ। এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বর্তমানে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, পরিবেশ দূষণ, এবং মানুষের অত্যাচারে হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির এই সুনিপুণ কারিগর বাবুই পাখি। সকলের সচেতনতা এবং সম্মিলিত প্রয়াস বিলুপ্তপ্রায় এই বাবুই পাখিকে টিকিয়ে রাখতে পারে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ (ক) এ, রাষ্ট্রকর্তৃক জীব-বৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ এর ৩৮ ধারায় সুস্পষ্টভাবে পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা, ইত্যাদির বিধান করা হয়েছে।
১। এই ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি তফসিল ১ ও ২ এ উল্লেখিত কোনো পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা করলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হইলে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
২। কোনো ব্যক্তি তফসিল ১ ও ২ এ উল্লেখিত কোনো পাখি বা পরিযায়ী পাখির মাংস, দেহের যেকোনো অংশ গ্রহণ করিলে, দখলে রাখিলে বা ক্রয় বিক্রয় করিলে বা বহন করিলে তিনি অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং উক্তরূপ অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটাইলে সর্বোচ্চ ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

চলুন, আমরা প্রকৃতির এবং জীবের প্রতি সদয় হই। প্রকৃতি বাঁচলেই মানুষ বাঁচবে।

অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার
প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্রঃ ঢাকা পোস্ট

অনুগ্রহ করে পোস্টটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটেগরির অন্যান্য পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *