1. [email protected] : amicritas :
  2. [email protected] : newsdhaka :
বুধবার, ১২ মে ২০২১, ০৮:২০ পূর্বাহ্ন

পাটের জীবনরহস্য, বীজ ও পাটের বিশ্ববাজার

আবদুল হাই রঞ্জু
  • শেষ আপডেট: বুধবার, ৩১ মার্চ, ২০২১

এককালে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত সোনালি আঁশ পাটের গৌরবময় অতীত হারিয়ে গেলেও নতুন করে আবার পাটের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। গত ২২ মার্চ দৈনিক দেশ রূপান্তরে ‘কমেছে পাট উৎপাদন হুমকিতে ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটি খুবই উদ্বেগের। বাজার অর্থনীতির সূত্রই হচ্ছে, যে পণ্যের দাম উৎপাদক বেশি পাবে, সে পণ্যই বেশি উৎপাদন করবে। কিন্তু পাটের ক্ষেত্রে এ সূত্রের বাস্তবতা ভিন্ন রকম। টানা ক’বছর ধরে পাটচাষিরা যেমন পাটের ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন, তেমনি পাট চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবানও হয়েছেন। গত মৌসুমে এক মণ পাট ছয়/সাত হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। স্বভাবতই পাটের উৎপাদন বাড়ার কথা। কিন্তু সেখানে পাট চাষের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে এমন খবর পাটশিল্পের জন্য যে বড় ধরনের অশনিসংকেত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একসময় পাটই ছিল দেশের শীর্ষ কৃষিপণ্য। রপ্তানি আয়ের প্রধান খাতও ছিল পাট, ছিল পাটের রমরমা ব্যবসা। সময়ের বিবর্তনে সবকিছু হারিয়ে গেছে। সরকারের উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে পাট হয়েছিল চাষিদের ‘গলার ফাঁস’। পাট উৎপাদন করে ন্যায্যমূল্যের অভাবে হাটে-বাজারে বিক্ষুব্ধ চাষিরা পাটে আগুন ধরিয়ে প্রতিবাদ পর্যন্ত করেছেন। যে কারণে একপর্যায়ে পাট চাষ ও পাটশিল্প মুখ থুবড়ে পড়ে। পাট হারিয়ে ফেলে তার ঐতিহ্য।

বাংলাদেশে পাট ও পাটশিল্প ধ্বংস হলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি, পাটশিল্পের বিকাশ ঘটেছে। যখন চারদলীয় জোট সরকার দাতা সংস্থার প্রেসক্রিপশনে এশিয়ার সর্ববৃহৎ পাটকল আদমজিকে ধ্বংস করেছে, তখন প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাটশিল্প তরতর করে এগিয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক তন্তুর কদর বৃদ্ধি পাওয়ায় পাট ও পাটজাত পণ্যের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার হচ্ছে। পরিবেশবিধ্বংসী পলিথিন, সিনথেটিকের আগ্রাসনে বিশ্বের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলছে। যে কারণে মানুষ এখন পলিথিনের বদলে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ফলে পাটপণ্যের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর যখন পাটপণ্যের চাহিদা সারা দুনিয়ায় বেড়েই চলছে, তখন আমাদের দেশে উপযুক্ত পরিবেশের অভাব, অযতœ-অবহেলায় পাট উৎপাদন ও পাটশিল্পের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হচ্ছে।

আবার দেশের প্রকৃতিরও পরিবর্তন হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এবং উজানের পানি একতরফাভাবে প্রত্যাহার করায় আমাদের দেশে এখন পানির সংকট দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে। নদী-নালা, খাল-বিল বলতে আর তেমন কিছুই নেই। এমনকি প্রমত্তা নদী এখন শুষ্ক মৌসুমে মানুষ হেঁটেই পার হচ্ছে। অর্থাৎ পানির সংকটে পড়ে পাটচাষিরা পাট উৎপাদন করে পচাতে পারছে না। অনেক সময়ই পানির অভাবে পাট শুকিয়ে যায়। ফলে পাটচাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আর বীজ সংকট তো লেগেই আছে। পাট চাষের মৌসুমে উপযুক্ত সময়ে পাটচাষিদের বীজ সংকটে পড়তে হয়। যে কারণে এখন পাটচাষিরা পাট চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মৌসুমে প্রায় ৫ হাজার ২০০ টন পাটবীজের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে ৭ থেকে ৮০০ টন দেশেই উৎপাদিত হয়। বাকি পাটবীজের পুরোটাই ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সুরজিত সাহা রায় এ প্রসঙ্গে বলেন, ভারত থেকে সময়মতো বীজ পাওয়া যাবে কি না, এ নিয়ে প্রতি বছরই একটা দুশ্চিন্তা থাকে। পাট একটি আদি কৃষিপণ্য। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি ৫০ বছর আগে। ঘটা করে পালিত হলো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। অথচ পাটবীজের দেশীয় চাহিদা পূরণ করতে হয় আমদানি করা বীজ দিয়ে। কী পরিমাণ অবহেলা থাকলে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের বীজের চাহিদা আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়, সেটা কারও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়!

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন করে অভাবনীয় সফলতা অর্জন করলেও পাটবীজের চাহিদা দেশীয়ভাবে পূরণে সফলতা অর্জন করতে পারেনি। বিলম্বে হলেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পাটবীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। সময়েই বলে দেবে এ প্রকল্পের সফলতা, বিফলতার প্রকৃত চিত্র! কিন্তু আমরা আশা করি, দেশীয়ভাবেই পাটবীজের চাহিদা পূরণ করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে চরম বীজসংকটে পড়তে হবে। দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত খবরটি থেকে আরও জানা যায়, প্রতিবেশী দেশ ভারত অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে পাটবীজ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। এটাই স্বাভাবিক। কারণ কোনো রাষ্ট্র তো নিজেদের ঘাটতি রেখে কোনো পণ্য রপ্তানি করবে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পাট ও পাটপণ্যের চাহিদা বিদেশে বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি আরও ভালো হচ্ছে। পাটের ক্ষেত্রে একদিকে ‘সোনালি আঁশ’ ও অন্যদিকে ‘রুপালি কাঠি’র সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনার। পাটকাঠি থেকে উৎপাদন হচ্ছে অ্যাকটিভেটেড চারকোল। যা থেকে তৈরি হচ্ছে কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আতশবাজি ও ফেসওয়াশের উপকরণ, ওয়াটার পিউরিফিকেশন প্লান্টের উপকরণ, মোবাইল ফোনের ব্যাটারি ও বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনী পণ্য। বিশেষ খবর হলো এসব পণ্য উচ্চমূল্যের এবং বিদেশে চাহিদা ও কদর দুটিই বেশি। ফলে দেশে উৎপাদিত পাটকাঠি যা একসময় শুধুই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো; সেটা এখন সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত প্রায় ৩০ লাখ টন পাটকাঠির অর্ধেক দিয়ে যদি চারকোল উৎপাদন করা যায়, তাহলে তা রপ্তানি করে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। এ ছাড়া পাটকলের বাই প্রোডাক্ট পাট কাটিংস ও নিম্নমানের পাটের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে নারকেলের ছোবড়ার সংমিশ্রণে প্রস্তুত হচ্ছে পরিবেশবান্ধব এবং ব্যয়সাশ্রয়ী ‘জুট-জিওটেক্সাইল’। যা দীর্ঘ মেয়াদে নদীর পাড় রক্ষা, পাহাড়ধস ও ভূমিক্ষয় ঠেকানো এবং রাস্তা ও বেড়িবাঁধ নির্মাণে দেদার ব্যবহৃত হচ্ছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জুট-জিওটেক্সাইলের অভ্যন্তরীণ বাজার এখন ৭০০ কোটি টাকার ওপর। এখন দেশের নদীগুলোকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় সরকার ভাঙন প্রতিরোধে উন্নয়নমুখী নানা প্রকল্প গ্রহণ করছে, যেখানে ব্যাপক পরিমাণ জুট-জিওটেক্সাইলের প্রয়োজন পড়ছে। শুধু কি তাই, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) পাটের পাতা দিয়ে অর্গানিক চায়ের উদ্ভাবন করেছে। বর্তমানে দেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পাটপাতার অর্গানিক চা উৎপাদন করছে। উত্তরায় গুয়াছি অ্যাকুয়া অ্যাগ্রোটেক নামক একটি প্রতিষ্ঠান পাটের পাতা দিয়ে তৈরি অর্গানিক চা জার্মানিতে রপ্তানিও করছে। পাটতন্তু দিয়ে ভালো মানের কাপড়ও এখন তৈরি হচ্ছে। এখন শাড়ি, লুঙ্গি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, ব্যাগ, খেলনা, শিকা, শোপিস, ওয়ালমেট, নকশিকাঁথা, পাপোশ, জুতা, স্যান্ডেল, দড়ি, সুতলি, দরজা-জানালার আকর্ষণীয় পর্দাসহ প্রায় ২৮৫ প্রকারের পাটজাত পণ্য দেশে ও বিদেশে বাজারজাত হচ্ছে।

পাটের জীবন-রহস্য উন্মোচনের মধ্য দিয়ে দেশে চাহিদামাফিক পাট উৎপাদনে সম্ভাবনার যে দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে সেটা কাজে লাগানো জরুরি। কিন্তু এ সময়েই সরকারের ভুলনীতির কারণে পাট চাষে কৃষকদের অনীহার কারণে পাট-অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার সমূহ আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। যে কারণে সরকারের উচিত, এখন পাট চাষ বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করে কৃষকদের জন্য সার, বীজ ও সহজশর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা।

কিন্তু মনে হচ্ছে সরকার পাটশিল্প থেকে এরই মধ্যে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সাত মাস ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ। হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মচারীকে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে বিদায় দেওয়া হচ্ছে। যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি, তখন স্বাধীনতার অঙ্গীকার রাষ্ট্রীয়করণ থেকে সরে এসে সরকার বিরাষ্ট্রীয়করণের পথকেই মসৃণ করছে। স্বাধীনতার মাসেই রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকলকে দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে লিজ বা ইজারা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। যদি মেয়াদকালীন ইজারায় দেশীয় ব্যবসায়ীরা রাজি না হয়, তাহলে বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে এই ইজারা দেওয়া হবে। মেয়াদকালীন ইজারার শর্তে দেশীয় ব্যবসায়ীরা রাজি না, কারণ তারা চায় সরকার নামমাত্র মূল্যে এসব রাষ্ট্রীয় সম্পদ তাদের কাছে একবারে বিক্রির ব্যবস্থা করুক। এরই মধ্যেই চীনা প্রতিষ্ঠান বৃহৎ দুটি পাটকল পরিদর্শন করে গেছে, হয়তো তারাও লিজ নিতে পারে।

সমস্যা হলো, ১৯৫০ সালের দিকে স্থাপিত দেশের পাটকলগুলো আর যুগোপযোগী করে আধুনিকায়ন করা হয়নি। ফলে এসব মিলে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় লোকসান গুনতে হয়। এখন যারা ইজারা বা লিজ নেবে তাদের আধুনিকায়ন করেই উৎপাদনে যেতে হবে। স্বভাবতই বিনিয়োগ বাড়বে, আর বিনিয়োগ বাড়লে তা উশুল হতে সময়ও লাগবে। ফলে স্বল্পমেয়াদি শর্তে সরকার শেষ পর্যন্ত হয়তো এসব হস্তান্তরে সফল নাও হতে পারে। তবে মাথাব্যথা হলে যেমন কেউ মাথা না কেটে, তা প্রশমনে ওষুধ সেবন করে। তেমনি ইজারা না দিয়ে ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করে উৎপাদনে গেলে অমিত সম্ভাবনার পাট আবার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত হয়ে ফিরে আসবে।

লেখক কৃষিবিষয়ক লেখক
[email protected]

সূত্র: দেশ রূপান্তর

অনুগ্রহ করে পোস্টটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটেগরির অন্যান্য পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *