1. md.sabbir073@gmail.com : amicritas :
  2. newsdhaka@newsdhaka.com : newsdhaka :
বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০১:৪১ পূর্বাহ্ন

পাকিস্তান-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক: পেছন ফিরে দেখা জরুরি

ড. মো. ফরহাদ হোসেন
  • শেষ আপডেট: রবিবার, ৯ মে, ২০২১

১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার জন্য তৎকালীন ওআইসি প্রধান মিশরের রাষ্ট্রপ্রধান আনোয়ার সাদাত বঙ্গবন্ধুকে আহবান জানান। বঙ্গবন্ধু অনোয়ার সাদাতকে বলেন, ‘যে দেশ আমার দেশকে স্বীকৃতি দেয়নি সে দেশে অনুষ্ঠিতব্য ওআইসি সম্মেলনে আমি কি করে যাই।’

এরপর আনোয়ার সাদাত পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোকে চাপ দেন এবং বলেন, হয় পাকিস্তান ওআইসি সম্মেলনের পূর্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিবে নতুবা ওআইসি সম্মেলনের ভেন্যু অন্যদেশে স্থানান্তরিত করা হবে। আনোয়ার সাদাতের সাথে অধিকাংশ ওআইসিভুক্ত দেশ একমত পোষণ করে। ফলে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব এবং ওআইসির চাপে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

বঙ্গবন্ধু লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনে যোগদান করেন এবং সেখানে বাংলাদেশে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করে একই সাথে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশে সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞ তুলে ধরেন। এরপর ওই একই বছর (১৯৭৪ সালে) জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশ সফর করেন। বঙ্গবন্ধু কৌশলে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান আদায় করেন কিন্তু পাকিস্তানের সাথে কোন ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন নি। কারণ বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পূর্বে পাকিস্তানের সাথে কতগুলো অমীমাংসিত বিষয় ফয়সালা করা জরুরি।

ওই অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল:
প্রথমত, ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সনে পাকিস্তানের জাতীয় কোষাগারে রক্ষিত সমস্ত সম্পদের আনুপাতিক হারে বন্টনপূর্বক বাংলাদেশের অংশ বাংলাদেশকে অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। কারণ তা বাংলাদেশের ন্যায্য প্রাপ্য, যেমন ১৯৪৭ সনের ১৪ই আগস্ট ব্রিটিশ ভারত বিভাজনের সময় দিল্লীর কেন্দ্রীয় কোষাগারে রক্ষিত সমস্ত সম্পদ (অর্থ, স্বর্ণ ইত্যাদি) আনুপাতিক হারে বণ্টন করে পাকিস্তানের প্রাপ্য অংশ পাকিস্তানকে দেয়া হয়েছিল। তেমনিভাবে বাংলাদেশের প্রাপ্য অংশ অবশ্যই বাংলাদেশকে ফেরত দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ১৯৪৭ সনের ১৪ই আগস্ট থেকে ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের মোট রাজস্ব বাজেট ও উন্নয়ন বাজেটের মোট অংশের কতো ভাগ বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) ও বাঙ্গালীদের জন্য খরচ করা হয়েছিল এবং কত ভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ও পশ্চিম পাকিস্তানিদের পিছনে খরচ করা হয়েছিল এবং ঐ অর্থের কত অংশ বাংলাদেশ থেকে আহরিত হয়েছিল এবং কত ভাগ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আহরিত হয়েছিল তার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব করে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশকে ফেরত দিতে হবে (বুঝিয়ে দিতে হবে)।

এখানে উল্লেখ্য যে, ’১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার সিংহভাগ-ই আসতো বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) সোনালী আঁশ বলে খ্যাত পাট, চা, চামড়া ইত্যাদি বিদেশে রপ্তানি করে। আর এর ৮৫ শতাংশ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য।
১৯৪৭ থেকে পাকিস্তান তার রাজধানী প্রথমে করাচি তারপর রাওয়ালপিন্ডি এবং শেষে ইসলামাবাদ বানিয়ে ওই তিনটি শহরকে তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত করেছে; সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীগুলোর সদরদপ্তর পশ্চিম পাকিস্তানে করে ঐ স্থানগুলোকে উন্নয়ন করে তিলোত্তমা নগরী করেছে। ফলে এ সকল স্থানে বিপুল অর্থ খরচ করেছে যার ছিটেফোঁটাও বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তানে) করেনি।

পাকিস্তানে প্রথম নিউক্লিয়ার রিয়াক্টর রাওয়ালপিন্ডিতে বসানো হয়, অথচ বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) পাবনার রূপপুরে ১৯৬৫ সনে এ জন্য ২৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে রাখে কিন্তু রিয়াক্টর বসায় রাওয়ালপিন্ডিতে। পশ্চিম পাকিস্তানের সিন্ধু নদের উপর প্রায় ৭ ও ৮ টি বাধ নির্মাণ করে জল সেচের ব্যবস্থা করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের এখানে একমাত্র তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করে তাও পানির জন্য ভারতের সাথে কোন ধরণের সমঝোতার চেষ্টা করেনি।
সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অফিসারদের ৯২ শতাংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিয়োগ প্রাপ্ত, সিএসপি অফিসারদের ৮৫শতাংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী অথচ অনেকবারই দেখা গিয়েছে সিএসপি পরীক্ষায় বাঙ্গালীরাই প্রথম স্থান অধিকার করেছে। ’১৯৪৭ এর পরে প্রতিষ্ঠিত শিল্প কারখানার ৭৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠা করেছে পশ্চিম পাকিস্তানে, দালান কোঠা, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ ও কালভাটের ৮০ শতাংশ অর্থ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। এমনি হাজারও বিষয় তুলে ধরা যাবে। তাই পাকিস্তানের এক সময়ের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মাহাবুবল হক ১৯৬৪ তার একটি বইতে লিখেছিলেন ‘আগামী ২৫ বছর পাকিস্তানের উন্নয়নের সমস্ত কাজ পশ্চিম পাকিস্তানে বন্ধ করে উন্নয়নের সমস্ত টাকা পূর্ব পাকিস্তানে খরচ করলেও পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন পশ্চিম পাকিস্তানের সমান হবে না’।

তৃতীয়ত, ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমাদের এই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে যে বেশুমার লুটতরাজ জ্বালাও পোড়াও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তার একটি সঠিক পরিসংখ্যান করলে এবং যে এক কোটি মানুষকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে তাদের বাড়ি ঘর লুটতরাজ করে ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে অগ্নি সংযোগ করে জ্বালাও পোড়াও এর মাধ্যমে যে ধ্বংসযজ্ঞ করেছে, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ ও কালভার্ট ভেঙ্গে ফেলে নষ্ট করেছে, নৌ বন্দরগুলোতে মাইন পুতে ধ্বংস করেছে, বিমান বন্দরগুলো ধ্বংস করেছে, শিল্প-কারখানা জ্বালিয়ে দিয়ে ব্যাংক, বীমা লুট করে ওরা আমাদের বাংলাদেশের প্রায় দুই লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতি সাধন করেছে। পাকিস্তান সরকারকে এই সকল ক্ষয়-ক্ষতির জন্য অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

চতুর্থত, পাক সেনারা এদেশে জ্বালাও-পোড়াও ও গোলাগুলির মাধ্যমে গণহত্যা চালিয়ে যে ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে এবং ওই নরপশু হায়নার দলের লোলুপ থাবায় এদেশের দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছে তার জন্য পাকিস্তান সরকারকে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের নিকট নিঃশর্তে ক্ষমা চাইতে হবে। এর পরে ভাবা যাবে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি। এর পূর্বে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রশ্নই উঠে না। এতে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া হোক বা না হোক, তাতে কিছু আসে-যায় না।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশে পাকিস্তানের তাবেদারদের দ্বারা গঠিত সরকারগুলো বাংলাদেশের স্বার্থের কথা সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে বাংলাদেশের আপামর জনতাকে অপমান করে এ দেশের ন্যায্য অধিকারের কথা না তুলে তড়িঘড়ি করে পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে পাকিস্তানের সাথে দহরম-মহরম সম্পর্ক স্থাপন করে। এতে একদিকে যেমন আমাদের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে আমাদের মর্যাদারও হানি হয়েছে বলে মনে করি।

দেশের এই সম্মান নষ্ট, স্বার্থের ক্ষতি ও ন্যায্য অধিকার বিসর্জন দেয়ার জন্য ওই সময়ের সরকার প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে বিচারের আওতায় আনার জন্য বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার প্রধান ও বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনাকে অনুরোধ জানাই। একই সাথে পাকিস্তান সরকারের নিকট উপরোল্লিখিত আমাদের অধিকার ও দাবিগুলো পুনঃ উত্থাপনের জন্য অনুরোধ জানাই। যদি সম্ভব হয় তো আন্তর্জাতিক আদালতে এ বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য অনুরোধ জানাই। স্বার্থপর, চশোমখোর, অসভ্য, দানব, নরপশু পাকিস্তান সরকারকে কোনও অবস্থাতেই এ থেকে অব্যাহতি দেয়া যায় না।

ড. মো. ফরহাদ হোসেন
অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, প্রাক্তন প্রো-উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

অনুগ্রহ করে পোস্টটি শেয়ার করুন

এই ক্যাটেগরির অন্যান্য পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *